ছোটবেলা থেকেই আমার লেখালেখির অভ্যাস। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় লেখি প্রথম কবিতা। সেটি কতটা ভালো হয়েছিল জানি না। তবে শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে লেখা সেই কবিতা পড়ে তারা খুব হেসেছিলেন এবং আমাকে উৎসাহও দিয়েছিলেন। এরপর টুকটাক লেখালেখি করলেও সেগুলো কখনো কাউকে দেখানোর সাহস হতো না।
মাধ্যমিকের বিদায় অনুষ্ঠানের দিন প্রতাপ কুমার ভট্টাচার্য স্যার আমাকে বলেছিলেন, ‘আর যাই করো, বাংলা ব্যাকরণটা ভালো করে শেখো।’ তখন কথাটির গুরুত্ব বুঝিনি। পরে লেখালেখি করতে গিয়ে বুঝেছি, স্যারের সেই পরামর্শ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অনার্সে পড়ার সময় ফেসবুকে টুকটাক লেখালেখি করতাম। একবার আব্বু-আম্মুর জন্মদিনে একটি কবিতা খুলনার একটি আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেটি ছিল আমার জন্য আনন্দের একটি মুহূর্ত। তবে তখনও লেখালেখিকে এগিয়ে নিতে বা সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভাবিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেকটা শখের বশেই সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হই। রসিকতা করে বললে, অবসর সময় কাটাতেই যেন সাংবাদিকতায় আসা। কিন্তু কাজ করতে করতে সংবাদ লেখা ও মানুষের কথা তুলে ধরার প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়। সেই ভালো লাগা থেকেই ধীরে ধীরে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া।
সাংবাদিকতার শুরুটা ছিল একটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। আমার লেখা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে মেহেদী ভাই আগ্রহ দেখান। পরে খুলনা গেজেটের যুগ্ম সম্পাদক দিদারুল আলম স্যার তাকে বলেন, এমন কেউ থাকলে যেন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে তিনি আমাকে সেখানে অংশ নেওয়ার জন্য রেফার করেন। প্রথম দিকে সাংবাদিকতা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। সেই প্রশিক্ষণই আমাকে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশের প্রথম সুযোগ করে দেয়। প্রশিক্ষণের পর ধীরে ধীরে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে পরিচয় হয়। মাঝেমধ্যে তাদের লেখা পড়তাম। এরপর খুলনা গেজেটের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ আসে। শুরুতে ভেবেছিলাম, কিছুদিন টাইপিং করব, সংবাদ লেখা দেখব, তারপর হয়তো আর থাকব না। কিন্তু সময়ের সাথে সংবাদ লেখার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। বুঝতে শুরু করি কোনো ঘটনা সংবাদযোগ্য, কোনো তথ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের প্রয়োজনের বিষয়গুলো কীভাবে তুলে ধরতে হয়।
আমার প্রথম রিপোর্টের স্মৃতি আজও মনে আছে। খুলনা নিউ মার্কেটের ‘গরিবের ফুডকোর্টে ধনীদের ভিড়’ নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়েছিলাম। একা যেতে কেমন যেন লাগছিল, তাই ছোট মামিকে সাথে নিয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলে তাদের বক্তব্য ও তথ্য সংগ্রহ করি। সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম নিউজটি লেখা হয়। প্রথম নিউজ করার সময় ভয় ও উত্তেজনা দুটিই কাজ করছিল। ভাবছিলাম, সবার বক্তব্য ঠিকভাবে নিতে পেরেছি কি না, কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে গেল কি না। আবার কারও সাহায্য ছাড়া নিজের লেখা প্রথম নিউজটি কেমন হয়েছে, সেটি নিয়েও এক ধরনের উত্তেজনা ছিল। তবে আমার করা নিউজগুলোর মধ্যে প্রথম ভালো লেগেছিল ‘হিট অ্যালার্ট কী বুঝি না, পেটের খিদের জন্য কাজ করতে হয়’ এই প্রতিবেদন। ময়লাপোতা থেকে সোনাডাঙ্গার পুরো রাস্তা হেঁটে বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলেছিলাম। প্রচণ্ড গরমে মানুষের কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা জানার চেষ্টা করেছিলাম। মানুষের সমস্যাগুলো নিজের চোখে দেখে, তাদের কথা শুনে সবার সামনে তুলে ধরতে পারার আনন্দ, সেদিন সাংবাদিকতার প্রতি আমার ভালো লাগা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সাংবাদিকতার ওপর আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। সংবাদ লেখা, তথ্য সংগ্রহ, ছবি তোলা কিংবা সোর্সের সাথে যোগাযোগসবই শিখেছি খুলনা গেজেটে কাজ করতে করতে।
খুলনা গেজেটের গাজী আলাউদ্দিন স্যার, কাজী মোতাহার রহমান বাবু স্যার, মোহাম্মদ মিলন ভাই, হিমালয় ভাই ও কৌশিক দে, মাহবুবুর রহমান ভাইয়ের কাছ থেকে সংবাদ লেখা শিখেছি। তারা শিখিয়েছেন কীভাবে বাক্য গঠন করতে হয়, তথ্য যাচাই করতে হয়, কোনো বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে একটি সংবাদ পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হয়। শুরুতে প্রায় প্রতিটি কাজেই ভুল হতো। কখনো বকাঝকা শুনেছি, কখনো লেখা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। তখন খারাপ লাগত, কিন্তু এখন বুঝি সেই ভুল ধরিয়ে দেওয়া ও সংশোধনই ছিল আমার সাংবাদিকতা শেখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
আমার অভিজ্ঞতা মাত্র পাঁচ বছরের। একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক হয়তো চল্লিশ বছর ধরে একটি শহরকে দেখেছেন। তিনি যে দৃষ্টিতে একটি ঘটনা, মানুষের চিন্তা ও প্রয়োজনকে দেখেন, সেই দৃষ্টিতে শহরটাকে দেখতে শেখার চেষ্টা করছি আমিও। এ জায়গায় আমার সিনিয়রদের ভূমিকা অনেক।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পাওয়া আমার কাছে শুধু সংবাদ লেখা নয়; বরং সমাজের এমন কিছু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারা, যাদের জীবন হয়তো অন্যভাবে কখনো জানা হতো না।
হিজড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে লেখা ‘অধিকার আর সম্মানের সঙ্গে বাঁচার স্বপ্নের খোঁজে হিজড়ারা’ প্রতিবেদন করার সময় তাদের সাথে কথা বলেছিলাম। তাদের কাছ থেকে শুনেছি, কীভাবে পরিবার ও সমাজ তাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। চাইলেও তারা পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি, সমাজের অন্য মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেননি। তাদের কথাগুলো আমাকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল।
হরিজন কলোনিতে গিয়েও একইভাবে নতুন একটি বাস্তবতার সাথে পরিচিত হয়েছি। তাদের সাথে কথা বলে বুঝেছি, সমাজের মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়ার পরও কীভাবে তারা সমাজের এক কোণে আড়ালে পড়ে থাকেন। তাদের জীবন, সংগ্রাম ও বাস্তবতা কাছ থেকে না দেখলে হয়তো কখনোই এতটা জানতে পারতাম না।
‘ব্রেইল, বাচনভঙ্গি আর হাতের ইশারায় লেখাপড়া শিখছে দৃষ্টি ও বাক্ প্রতিবন্ধীরা’ এই প্রতিবেদনটি করতে গিয়ে সেই মানুষগুলোর খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। দেখেছি, তারা কারও বোঝা হয়ে নয়, বরং সমাজের সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষগুলোর সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে এবং স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে প্রতিনিয়ত নিজেদের তৈরি করছে। তাদের না পারা, অসুস্থতা, সীমাবদ্ধতা ও কষ্টগুলো খুব কাছ থেকে দেখার পর আমার মনে হয়েছিল আমি বোধ হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষগুলোর একজন। কারণ, জীবনে যা কিছু পেয়েছি, সেগুলোর মূল্য হয়তো তাদের জীবন-সংগ্রাম না দেখলে এতটা গভীরভাবে কখনোই উপলব্ধি করতে পারতাম না।
সাংবাদিকতায় না এলে হয়তো সমাজের খেটে খাওয়া ছিন্নমূল মানুষের জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগই হতো না। তাদের কথা তুলে ধরতে পারাটাই সাংবাদিকতার প্রতি আমার ভালো লাগার অন্যতম কারণ।
সাংবাদিকতার জীবনে কিছু ঘটনা কখনো ভুলে যাওয়া যায় না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলো তেমনই একটি সময়। প্রতিদিন উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটত। একের পর এক মৃত্যুর খবর করতে হয়েছে। ২৫ সালের জুলাইয়ে মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনার পর ছোট ছোট শিশুদের পুড়ে যাওয়া শরীর, ক্ষত-বিক্ষত লাশ এবং একের পর এক মৃত্যুর খবর আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এসব ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছি।
সাংবাদিকতায় এসে বুঝেছি, এটি শুধু একটি পেশা নয়; প্রতিদিন নতুন করে শেখার একটি সুযোগ। সময়ের সাথে সাংবাদিকতা ধরন বদলাচ্ছে। প্রযুক্তির সাথে বদলাচ্ছে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের পদ্ধতি। আমিও প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করছি। একসময় সংবাদ কী, কীভাবে লিখতে হয়Ñ সেটাই বুঝতাম না। এখন অন্তত কিছুটা বুঝতে শিখেছি। সবচেয়ে বড় চেষ্টা থাকে খুলনা গেজেটের মাধ্যমে মানুষের সামনে নির্ভুল, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা।
আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি খুলনা গেজেটে। তাই আমার সাংবাদিক হয়ে ওঠার গল্পের সাথে এই প্রতিষ্ঠানটির নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। খুলনা গেজেটকে আমি শুধু একটি কর্মস্থল হিসেবে দেখি না, এটি আমার সাংবাদিকতা শেখার কেন্দ্রস্থল। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকতায় না পড়েও এখানকার সিনিয়র ও সহকর্মীদের কাছ থেকে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পেয়েছি। আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সাংবাদিকতায় আসাটা শুরু হয়েছিল শখের বসেই, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি আমার ভালো লাগা, আমার পেশা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হয়ে উঠেছে। আর সেই পথচলার শুরুটা হয়েছিল খুলনা গেজেটের হাত ধরেই। কলম হাতে আমার পথচলার সেই শুরুটিই আজ আমার সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় স্মৃতি।
খুলনা গেজেট শুধু অনলাইনে নয়, ছাপা পত্রিকায়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ‘সব সংবাদ সবার আগে’। খুলনা গেজেট নবীন ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের সমন্বয়ে ‘সবার আগে সঠিক খবর’ স্লোগানকে ধারণ করে মানুষের কথা তুলে ধরবে এবং গণমানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
খুলনা গেজেট/এএজে

